ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প

প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির ফুলবাড়ী কয়লা খনি

অধ্যায় ০৭ ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প

প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির ফুলবাড়ী কয়লা খনি

এশিয়া এনার্জি বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আওতায় ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক জরিপের মাধ্যমে ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসারে ৫৭২ মিলিয়ন টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার মজুদ নিশ্চিত করেছে। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিই এই কয়লা সম্পদ অর্থনৈতিক ও কারিগরী বিবেচনায় লাভজনকভাবে উত্তোলনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায় বলে নিশ্চিত করেন দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

ফুলবাড়ী কয়লা মজুদ (খনি খাদ) এলাকা গড়ে দৈর্ঘ্যে ৮ কিলোমিটার (উত্তর-দক্ষিণে) এবং প্রস্থে ৩ কিলোমিটার (পূর্ব-পশ্চিম) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং দু’টি প্রধান স্তর বিশিষ্ট। কয়লা স্তরগুলোর মোট পুরুত্ব ১৫-৬৫ মিটার এবং ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৫০-২৭০ মিটার গভীরে অবস্থিত। কয়লা সম্পদের উপরে প্রায় ১৬০ মিটার পুরুত্বের টারশিয়ারী সময়কালের বালি, পলি (সিল্ট), নুড়িপাথর ও কাদা এবং পারমিয়ান সময়কালের শিলাস্তর রয়েছে।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কিত সমীক্ষার পর স্পষ্ট হয়েছে যে, ফুলবাড়ীতে ভূ-গর্ভস্থ খনি পদ্ধতি অনিরাপদ ও অলাভজনক। এ পদ্ধতিতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বা তার চেয়ে কম সম্পদ উত্তোলন করা সম্ভব যা এটিকে একটি অলাভজনক প্রকল্পে পরিণত করবে। পাশাপাশি দেশের মূল্যবান সম্পদেরও অপচয় ঘটাবে। একই ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতায় ভূগর্ভস্থ খনির পূর্ব অভিজ্ঞতাও খুব হতাশাব্যঞ্জক।

ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্রে কয়লার মজুদ ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় এবং বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক অবস্থায় উন্মুক্ত পদ্ধতিই হচ্ছে কয়লা উত্তোলনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পন্থা। এ পদ্ধতিতে ৯০ শতাংশেরও বেশী সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উপায়ে উত্তোলন সম্ভব। উন্মুক্ত খনি পদ্ধতিতে ব্যবহার উপযোগী কিছু মূল্যবান সহ-সম্পদ (Co-products) যেমনঃ চীনামাটি (কেওলিন ক্লে), উন্নতমানের কাঁচ বালি (High quality glass sand), নুড়ি পাথর ইত্যাদিও লাভজনক উপায়ে উত্তোলন সম্ভব।

কয়লা ক্ষেত্রের উত্তর দিক থেকে প্রাথমিক বক্স-কাট খননের মাধ্যমে খনির কার্যক্রম শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে তা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হবে। এতে প্রাথমিকভাবে খনন এলাকা, সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও অবকাঠামো মিলিয়ে প্রায় ২,০০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন। খনির পুরো মেয়াদকালে খনি ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োজন হবে মোট ৫,৯৩৩ হেক্টর জমি। প্রাথমিকভাবে কয়লার উপরিস্থিত শিলাস্তর সমূহ খনি এলাকার পূর্বপার্শ্বে আচ্ছাদন শিলাস্তুপ এলাকায় (Overburden Dump Area) জমা করা হবে। এখানে উত্তোলিত শিলাস্তর সমূহের প্রায় ২৫% জমা রাখা হবে। খনি কার্যক্রম প্রতি বৎসর প্রায় ২০০ মিটার করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হবে এবং খনি উন্নয়ন কাজ শুরুর প্রায় ৬ বৎসর পর থেকে প্রথম খনিখাদ এলাকা থেকে কয়লা উত্তোলন শেষে পুণর্ভরণ কাজ শুরু হবে। প্রায় ৭০% উত্তোলিত শিলাস্তুপ এভাবে খনিখাদের মধ্যেই জমা করা হবে। খনি উত্তর থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হবার ধারাবাহিকতায় সম্মুখ দিকের আচ্ছাদন শিলাস্তরসমূহ অপসারণ করে কয়লা আহরণ করা হবে এবং আগের খননকৃত এলাকা পুনর্ভরণ ও পুনর্বাসন করা হবে। ভূমি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুনর্ভরণকৃত এলাকা এবং আচ্ছাদন শিলাস্তুপ এলাকা পর্যায়ক্রমে উৎপাদনশীল ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা হবে।

খনির ৩৫ বছরেরও অধিক মেয়াদকালে প্রতি বছর ১৫.২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। খনির মেয়াদকাল শেষে (প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে) খনির শেষাংশের খাদটি (৬৯৬ হেক্টর) পানি সরবরাহ, সেচ, বিনোদন ও মাছ চাষের জন্য একটি মিঠা পানির হ্রদে পরিণত করা হবে।

জমি পুনরুদ্ধার

উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি ভূমি ব্যবহারের একটি সাময়িক পরিবর্তন মাত্র এবং জমি ক্রমাগত উৎপাদনশীল ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা হয়। ফুলবাড়ী কয়লা খনি তার ৩৫ বছরেরও বেশি মেয়াদে পর্যায়ক্রমে মোট ৫,১৯২ হেক্টর জমি ব্যবহার করবে। কয়লা উত্তোলনের পরপরই খননকৃত জমির পুনরুদ্ধার শুরু হবে এবং ৬৯৬ হেক্টরের একটি স্বাদুপানির হ্রদ ছাড়া বাকি জমি পরিকল্পিতভাবে মূলত কৃষিসহ উৎপাদনশীল ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা হবে।

যে কোন খনন কার্যক্রমের আগে উপরের ২ মিটার মাটি (টপসয়েল) আলাদাভাবে সরিয়ে বিশেষ যত্নে সংরক্ষণ করা হবে। কয়লা উত্তোলনের পর খনিখাদ পর্যায়ক্রমে ভরাট ও পুনরুদ্ধার করা হবে এবং সংরক্ষিত টপসয়েল পুনরুদ্ধারকৃত জমির উপরিভাগে পুনরায় ছড়িয়ে দেয়া হবে। এটি মাটির স্তরবিন্যাস পুনর্গঠনে এবং স্বনির্ভর উদ্ভিদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। জমি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান এবং জমিকে উৎপাদনশীল ব্যবহারে ফিরিয়ে আনতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে।

৪৩%
কৃষি জমি (২,৫৫০ হেক্টর)
৩৩%
বন ও বাগান (১,৯৪৬ হেক্টর)
১২%
মিঠাপানির হ্রদ (৬৯৬ হেক্টর)

খননকৃত জমি পুনরুদ্ধার বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং একদা উন্মুক্ত খনি ছিল এমন জমিতে সবুজ মাঠ, বন, শিল্প ইউনিট, বিনোদন সুবিধা এমনকি বিমানবন্দর গড়ে ওঠার অনেক উদাহরণ রয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো অনুকূল জলবায়ুতে পুনরুদ্ধারকৃত জমি কয়লা উত্তোলনের ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে উৎপাদনশীল কৃষি ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

পুনরুদ্ধারের পর প্রকল্পের চূড়ান্ত ভূমিরূপ হবে কৃষি (৪৩%), বন (৩৩%), জলাশয় (১২%) ও বসতি (১১%), যা ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।