ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (২০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর)

অধ্যায় ১৪ ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (২০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর)

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প, প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ-পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক সুফল সম্পর্কিত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ প্রশ্নের বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক উত্তর।

ফুলবাড়ী বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রমাণিত কয়লা সম্পদ। ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষায় ৫৭২ মিলিয়ন টন (JORC মানদণ্ড অনুসারে) বিশ্বমানের কয়লা সম্পদ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭৫ মিলিয়ন টন উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনযোগ্য মজুদ (৮৩ শতাংশের বেশি উত্তোলন)।

কয়লা স্তরগুলো ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার (৪৯২-৮৮৬ ফুট) গভীরতায় অবস্থিত। মোট ৫টি কয়লা স্তর রয়েছে, তবে পাশাপাশি গভীরতায় থাকা দুটি প্রধান স্তরে (আপার ও মেইন) মোট মজুদের ৯০ শতাংশের বেশি কয়লা রয়েছে। কয়লা স্তরগুলোর গড় পুরুত্ব ৩৮ মিটার।

অত্যন্ত কার্যকর উন্মুক্ত খনি পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে, যা সর্বোচ্চ উত্তোলন (৮৩ শতাংশের বেশি) নিশ্চিত করবে। কয়লার পাশাপাশি উন্মুক্ত খনন প্রক্রিয়ায় কয়লার উপরিস্থ বালি-পাথর (Overburden Materials) থেকে কেওলিন ক্লে, উচ্চমানের সিলিকা ও নির্মাণ বালির মতো মূল্যবান শিল্প সহ-খনিজ পদার্থ পাওয়া যাবে, বাজারে যার বিপুল চাহিদা রয়েছে।

খনির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৫.২ মিলিয়ন টন – যা দেশের বর্তমান কয়লা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ভরযোগ্যভাবে পূরণ করবে। ফুলবাড়ী খনি থেকে ৩৫ বছরের বেশি ধরে কয়লা উত্তোলন করা যাবে।

কয়লা উত্তোলন পদ্ধতি নির্ধারণ সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষেত্র-ভিত্তিক এবং বিভিন্ন কারিগরি বিষয়াদি যেমন, মজুদ এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন, কয়লা স্তরের অবস্থান, গভীরতা, উপরিস্থিত শিলাস্তর ও পানিবাহী স্তরের প্রকৃতি, কয়লা স্তরের সংখ্যা ও পুরুত্ব, সম্পদ উত্তোলন, খনি ও শ্রমিক নিরাপত্তা, আর্থিক সম্ভাব্যতা ইত্যাদি কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নির্ধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রকল্প এলাকায় পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ভূতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিবেচনায় উন্মুক্ত খনি পদ্ধতিই সর্বোত্তম। এখানে সম্পদ উত্তোলন, খনি ও শ্রমিক নিরাপত্তাসহ কোনো বিবেচনাতেই ভূগর্ভস্থ খনি উন্নয়ন উপযুক্ত হবে না। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে একই ভূতাত্ত্বিক গঠনে বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন কয়লার মধ্যে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন টন (১০ শতাংশের কম) উত্তোলন সম্ভব, যেখানে ফুলবাড়ীতে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মধ্যে ৪৭৫ মিলিয়ন টন (৮৩ শতাংশের বেশি) উত্তোলন করা যাবে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতাও অনেক বেশি। বড়পুকুরিয়া ভূগর্ভস্থ খনির উৎপাদন তার ২০ বেশি বছরের মেয়াদে কদাচিৎ বছরে ১ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। সেখানে ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনি থেকে বার্ষিক ১৫.২ মিলিয়ন টন উৎপাদন করা যাবে, যা দেশের বর্তমান তাপীয় কয়লা চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণে যথেষ্ট। এছাড়া উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কাঁচবালি , কেওলিন ক্লে, নুড়ি পাথর ইত্যাদির মতো সম্ভাবনাময় সহ-খনিজ পদার্থ উত্তোলন সম্ভব হবে। সীমিত সম্পদ উত্তোলনের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যা কয়লাকে বাণিজ্যিকভাবে অনাকর্ষণীয় পণ্য করে তুলবে।

উত্তরাঞ্চলের কয়লার মান সাধারণভাবে অত্যন্ত উঁচু। এটি বিটুমিনাস ধরনের কয়লা, যার ক্যালরিফিক মান (Calorific value) অনেক বেশি (গড়ে ৬,৬০০ কিলোক্যালরি/কেজি), ছাই কম (১২-১৫%) এবং সালফার খুব কম (১ শতাংশের কম)। এই কয়লার মান আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাতকৃত যেকোনো প্রিমিয়াম মানের তাপীয় কয়লার সমতুল্য বা তার চেয়েও ভালো।

বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি। কয়লা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৩৬ শতাংশ যোগান দেয়; বৈশ্বিক ইস্পাত উৎপাদনের ৭০ শতাংশ কয়লার উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার খুবই সীমিত ছিল (মাত্র প্রায় ৩%), কিন্তু ২০২০ সাল থেকে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হতে শুরু করলে তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কয়লা বিদ্যুৎ এখন মোট স্থাপিত ক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশ। নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (৭,০০০ মেগাওয়াটের বেশি) সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। বর্তমানে বার্ষিক ২০ মিলিয়ন টনের বেশি কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। দ্রুত নি:শেষমান দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের বাইরে কয়লা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক জ্বালানি উৎস। অসংখ্য ইটভাটা ও কিছু ক্ষুদ্র শিল্পে কয়লার ব্যবহার রয়েছে, যা-ও আমদানিনির্ভর। ফুলবাড়ী খনি পূর্ণ ক্ষমতায় সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও মানের নিশ্চয়তাসহ দেশের তাপীয় কয়লা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করতে পারে, যা বার্ষিক ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় করবে। একমাত্র ফুলবাড়ীর কয়লাই বাংলাদেশের জন্য ৬,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি যোগান দিতে পারে। আমদানিকৃত কয়লা সাধারণত নিম্নমানের, কম শক্তিসম্পন্ন (৪,০০০-৫,০০০ কিলোক্যালরি/কেজি GAR); সমপরিমাণ ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশি কয়লার তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কয়লা প্রয়োজন হয়। ফুলবাড়ীত প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক খনিমুখ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।

হ্যাঁ, ‘বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের’ জন্য এশিয়া এনার্জির সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি রয়েছে।

প্রকল্পের ৩৫ এর বেশি বছর মেয়াদে খনি উন্নয়নে ৫,১৯২ হেক্টর জমির প্রয়োজন। তবে খনি উন্নয়নের কোনো পর্যায়েই একসঙ্গে ২,০০০ হেক্টরের বেশি জমির প্রয়োজন হবে না। উন্মুক্ত পদ্ধতির খনি ‘ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থার একটি সাময়িক পরিবর্তন মাত্র’, এতে জমির কোনো স্থায়ী ক্ষতি নয়; আর প্রক্রিয়াটি ধীর ও পর্যায়ক্রমিক। ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনির কার্যক্রম ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে উত্তর থেকে দক্ষিণে বছরে প্রায় ২০০ মিটার হারে অগ্রসর হবে।

কয়লা উত্তোলনের পর জমি পর্যায়ক্রমে ভরাট ও পুনরুদ্ধার করে কৃষিসহ উৎপাদনশীল ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা হবে। উল্লেখ্য খনি কার্যক্রমে ব্যবহারের পুর্ব পর্যন্ত বা অব্যবহৃত জমি এবং কয়লা উত্তোলনের পর পুনরুদ্ধারকৃত জমি উভয়ই – কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনশীল ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ভূগর্ভস্থ খনির মতো ফুলবাড়ী উন্মুক্ত খনি উন্নয়নে ভূমির অবনমন (Land subsidence) ঘটবে না।

‌উল্লেখ্য, মোট ৫,১৯২ হেক্টরের মধ্যে ১,০৩৪ হেক্টর খনি ও আশপাশের বসতির মধ্যে ‘বাফার এলাকা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যেখানে সবুজায়নসহ শব্দ দূষণ-প্রতিরোধী দেয়াল নির্মাণ করা হবে এবং কৃষি ও অন্যান্য খনি-বহির্ভুত কার্যক্রম চলতে পারবে। অর্থাৎ মোট খনি এলাকার প্রায় ২০ শতাংশ খনি-বহির্ভূত কাজে ব্যবহৃত হবে।

কয়লা উত্তোলন ও ভূমি পুনরুদ্ধারের পর খনি এলাকার চূড়ান্ত ভূমিরূপ হবে কৃষি, বন, জলাশয় ও বসতির একটি ভারসাম্যময় সমন্বয়।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পরিচালিত পুনর্বাসন জরিপ ও পরবর্তী যাচাই অনুযায়ী, খনি এলাকায় বসবাসকারী মোট পরিবারের সংখ্যা ৯,১৬০ ( প্রায় ৪০,০০০ জন)।

খনি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন প্রকল্প-প্রস্তুতকৃত পুনর্বাসন এলাকায় স্থানান্তর করা হবে। তবে পুনর্বাসন এলাকায় স্থানান্তর একসঙ্গে হবে না; খনি উন্নয়ন সূচি অনুযায়ী ১২ থেকে ১৫ বছরে ৬টি ভিন্ন পর্যায়ে তা সম্পন্ন হবে। খনি উন্নয়নের প্রথম ৩ বছরে পুনর্বাসিত পরিবারের (খানা) সংখ্যা হবে প্রায় ২,৬০০।

প্রথমত, এশিয়া এনার্জির নিজস্ব প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা। কোম্পানি দীর্ঘ সময় ( ৩৫ বছরের বেশি) ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে থাকবে; তাই স্থানীয় জনগণের সুবিধা নিশ্চিত না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন অসম্ভব। প্রকল্পে অর্থায়নে ভূমিকা রাখবে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা, তারা কোম্পানির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে এবং সকল কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পাদনে তাদের কাছেও কোম্পানি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যথায় অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে, যা প্রকল্প কার্যক্রম বন্ধের দিকে নিয়ে যাবে – যা কারও কাম্য নয়। তাছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর, স্থানীয় জনগণ, এনজিও বা অন্যান্য সংস্থারও খনি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে। এশিয়া এনার্জি তার কার্যক্রম যথাযথ ও জবাবদিহিমূলক করতে সবসময় পরামর্শ ও সহায়তাকে স্বাগত জানায়।

এশিয়া এনার্জি পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ব্যবস্থাপনার জন্য সর্বোত্তম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নির্দেশিকা অনুযায়ী ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রভাব প্রশমন ও ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং যেখানে সম্ভব পরিবেশ উন্নত করা হবে, যেমন পাইপলাইনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি কৃষি, সেচ এবং শহর ও গ্রামে সরবরাহ,, ভূগর্ভস্থ অ্যাকুফারে পানি পুনঃপ্রবেশ এবং খনিখাদ পুন:ভরাটের সঙ্গে সঙ্গে জমিতে বনায়ন । একটি বর্জ্য পানি পরিশোধন সুবিধা স্থাপন করা হবে এবং খনি কার্যক্রম থেকে উৎপন্ন সকল বর্জ্য পানি সংগ্রহ, পরিশোধন এবং অগ্রাধিকারভিত্তিতে খনিতেই পুনর্ব্যবহার করা হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ না করে কোনো পানি পার্শ্ববর্তী নদী-জলাশয়ে ছাড়া হবে না। বায়ু, পানি, শব্দ ইত্যাদিসহ সকল পরিবেশগত সূচকের জন্য একটি ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনা ও তথ্য প্রকাশের বিধান থাকবে।

অভ্যাসগত চর্চার মতো করে পানি প্রাপ্তিতে সাময়িক কিছু অসুবিধা হতে পারে, তবে পানির কোনো সংকট হবে না। বিশ্বের অনেক উন্মুক্ত খনির মতো খনি এলাকা থেকে উত্তোলিত পানি গৃহস্থালি ও সেচের কাজে সরবরাহ করা হবে। এছাড়া পানির স্তর নেমে যাওয়া খনি সন্নিহিত এলাকার মধ্যে সীমিত রাখতে এবং খনির প্রভাবিত এলাকার বাইরে পানির স্বাভাবিক স্তর বজায় রাখতে ভূগর্ভস্থ অ্যাকুফারে পানি পুনঃপ্রবেশ করানো হবে। এটি বিশ্বস্বীকৃত একটি খনি পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। ভাটির প্রবাহ ব্যবস্থা ও জলজ পরিবেশ বজায় ও উন্নত করতে পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে স্বাদু পানিও ছাড়া হবে। অন্য কথায়, গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য পাইপলাইনে পানি সরবরাহসহ এলাকার জনগণ সকল ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি প্রাপ্তিতে উন্নততর ব্যবস্থা লাভ করবে।

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প প্রধানত: জীবিকানির্ভর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্পদ, কর্মসংস্থান ও সুযোগ নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশকে একটি খনি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত করবে।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করে এশিয়া এনার্জি একটি পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপন পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবিকা পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নে তাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবে। এ জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবিকা পুনরুদ্ধার কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। জীবিকা পুনরুদ্ধারের প্রধান পদক্ষেপসমূহ নিম্নরূপ:

  • জীবিকা বৈচিত্র্যকরণ ও উন্নয়ন উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সহায়তা করতে সামাজিক বিনিয়োগ তহবিল
  • খনি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ২০,০০০ এর বেশি নতুন চাকরি (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ)। বেকার যুবক ও চাকরিরপ্রার্থীদের প্রস্তুত করতে উপযুক্ত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
  • প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসংস্থান কৌশল
  • নতুন ব্যবসা ও বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণপ্রাপ্তি ও প্রশিক্ষণসহ নানা সহায়তা
  • কৃষিকে উৎপাদনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিকল্প জীবিকায় পরিণত করতে সারা বছর বিনামূল্যে সেচের পানি, প্রশিক্ষণ, কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও কারিগরি জ্ঞান ও চাষ পদ্ধতির চর্চা
  • জীবিকা কার্যক্রমের সাময়িক বিঘ্ন মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা

এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন খনি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবে। তাদের সর্বাধিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে প্রকল্পের জন্য একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসংস্থান কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। খনি ও সংশ্লিষ্ট চাকুরির জন্য মানুষকে প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি থাকবে।

প্রকল্পটি খনি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে ২০ হাজারের বেশি (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তাছাড়া খনির উন্নয়ন সহায়ক শিল্পের জন্ম দেবে, যা স্থানীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে এবং আরও আনুষঙ্গিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

২ বছরব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এশিয়া এনার্জি ব্যাপকভাবে যুক্ত ছিল। দলীয় আলোচনা/পরামর্শ, লিফলেট/ভিডিও সিডি বিতরণসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান করা হয়েছে। মানুষকে প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্যাদির সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আরও তথ্যপ্রদান ও প্রচার কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের স্থানান্তরের অনেক আগেই ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাবেন এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং স্থানান্তরের জায়গা (আবাসন) ছাড়া কাউকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হবে না। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যসংবলিত একটি ‘প্রাপ্যতা কার্ড’ (Entitlement Card) প্রদান করা হবে।

হ্যাঁ, অনেক আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারের পাশাপাশি অনেক বাঙালি পরিবারেও এই সমস্যা বিদ্যমান। তবে জমির মালিকানা স্বত্ব নির্বিশেষে মানুষকে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং তারা যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার অধিকারী হবে। এশিয়া এনার্জি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভূক্ত মানুষের জমি ও সম্পদের উপর তাদের প্রথাগত অধিকারকেও স্বীকৃতি দেয় এবং সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় এসব মানুষও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর যথাযথ যত্ন নেওয়ার লক্ষ্যে একটি পৃথক আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন পরিকল্পনা (বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম) প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় কৃষিই প্রধান জীবিকা কার্যক্রম হিসেবে থাকবে। যেহেতু প্রকল্পের ভূমি ব্যবহার পর্যায়ক্রমে হবে, তাই সবসময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কৃষিকাজের জন্য সহজলভ্য থাকবে। একটি স্বাধীন সমীক্ষায় দেখা যায়, নিবিড় চাষ ও উন্নত কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ এলাকায় কৃষি উৎপাদনের প্রাথমিক ক্ষতি পুষিয়ে দেবে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা আরও বৃদ্ধি পাবে।

উন্নত কৃষি পদ্ধতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং প্রকল্প-পূর্ব সময়ের চেয়ে উচ্চতর কৃষি উৎপাদন অর্জনে প্রকল্প একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কৃষকরা সারা বছর বিনামূল্যে প্রচুর সেচের পানি উপভোগ করবে; এবং প্রশিক্ষণ, কৃষি উপকরণ, কারিগরি জ্ঞান, চাষ পদ্ধতি ও বিপণনে সহায়তা পাবে।

রয়্যালটি হলো খনি শিল্পের জন্য বিশেষ এক ধরনের কর, যা খনিজ সম্পদ উৎপাদনকারী কোম্পানীকে খনি উন্নয়নের অধিকারের প্রদান করে। বাংলাদশের খনি ও খনিজ বিধিমালাতে (সংশোধিত) কয়লার উত্তোলনে রয়্যালটির হার নির্ধারণ করা আছে, যা বিশ্বের অন্যান্য খনি খাতের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রয়্যালটি সরকারকে প্রদত্ত সামগ্রিক আর্থিক সুবিধার একটি অংশ মাত্র। অন্যান্য প্রধান আর্থিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে কর্পোরেট কর, আমদানি শুল্ক, লভ্যাংশের উপর উৎসে কর, মালামাল পরিবহণের মাশুল, বন্দর শুল্ক ইত্যাদি। খনির মেয়াদে দেশের নিট আয় হবে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। উল্লেখ্য, তেল-গ্যাস খাতের প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পে খরচ উসুলের কোনো বিধান নেই এবং সকল আর্থিক দায় প্রকল্প প্রস্তাবক কোম্পানির উপর বর্তায়।

প্রকল্পটি দেশকে প্রাথমিক জ্বালানির একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প উৎস দেবে, যা দেশের তাপীয় কয়লা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করতে পারে এবং বার্ষিক প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় করবে। আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত হবে।

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প দেশের একটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে খনি ও শিল্পোন্নত অঞ্চলে পরিণত করতে সহায়তা করবে। এটি শুধু একটি খনি নয়, একটি ‘সুযোগ’, যা দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটি বড় ইতিবাচক রূপান্তরে সহায়তা করবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটি খনির মেয়াদজুড়ে প্রতি বছর ১% জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটাবে।

বিদ্যমান খনি ও খনিজ বিধিমালায় নির্ধারিত ৬% রয়্যালটির হার বিশ্বের অন্যান্য খনি খাতের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। রয়্যালটি দেশের প্রাপ্য সামগ্রিক আর্থিক সুবিধার একটি ক্ষুদ্র অংশ। অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে কর্পোরেট কর (৪৫%), আমদানি শুল্ক (২.৫%), লভ্যাংশের উপর উৎসে কর (৫%), মালামাল পরিবহণের মাশুল, বন্দর শুল্ক ইত্যাদি। খনির মেয়াদে দেশের নিট আয় হবে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

ফুলবাড়ী কয়লা খনি সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে পরিচালিত প্রকল্প (প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ)। তেল ও গ্যাস খাতের মতো এই খনি উন্নয়ন ও পরিচালনায় সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক দায় নেই। তবে খনির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সরকারি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহায়তা অপরিহার্য।

সামগ্রিকভাবে খনি জীবনচক্র বিনিয়োগ (উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়) প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে।

ফুলবাড়ী দেশের একমাত্র খনি প্রকল্প যা অবিলম্বে উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত। খনি উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর ১৫ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কয়লা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

পানি সম্পদের উপর খনি কার্যক্রমের সম্ভাব্য প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং একটি ব্যাপক পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দ্বারা পর্যালোচিত । এশিয়া এনার্জি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, পানির বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং প্রকল্পের পুরো মেয়াদে এবং তার পরেও প্রতিটি পরিবার, ব্যবসা ও কৃষকের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকবে, এবং কেউ পানির অভাবে ভুগবে না।

প্রকল্পের বিস্তারিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • ভূগর্ভস্থ অ্যাকুফারে পানি পুনঃপ্রবেশ (aquifer injection) – পানির স্তর বজায় রাখতে এবং এভাবে পানির স্তর নেমে যাওয়াকে প্রকল্প সন্নিহিত এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে একটি প্রমাণিত পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল
  • ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমিতে সারা বছর বিনামূল্যে সেচের পানি সরবরাহ করা। কার্যকর সরবরাহের জন্য একটি বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্ক স্থাপন
  • গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম/পরিবার ও সামাজিক স্থানে পানি পৌঁছে দিতে একটি পাইপযুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
  • ভাটির দিকে স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে অতিরিক্ত বিশুদ্ধ পানি পার্শ্ববর্তী নদী ও জলাশয়ে সরবরাহ