পানি ব্যবস্থাপনা
উন্মুক্ত পদ্ধতির খনিতে পানি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফুলবাড়ী ও আশপাশের এলাকার পানির উৎস, বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের পানি ব্যবহারের ধরন মূল্যায়ন করে ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের জন্য একটি বিস্তারিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।
খনি শুষ্ক রাখা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে উন্মুক্ত খনিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন প্রয়োজন হয়। এতে খনি এলাকা ও তার আশপাশে বিভিন্ন মাত্রায় পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে এবং গৃহস্থালি, কৃষি ও অন্যান্য কাজে পানির প্রাপ্যতা সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এশিয়া এনার্জি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমন্বিত প্রশমন ব্যবস্থার আওতায় পানি উত্তোলনের সম্ভাব্য প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম, ফুলবাড়ী শহর ও কৃষিতে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে। এশিয়া এনার্জি ব্যবস্থাপনা কৌশল আরও উন্নত করতে বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং এলাকার জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে, যাতে তা প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ও জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করে।
পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে খনি এলাকা থেকে উত্তোলিত পানির একটি অংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে বিদ্যমান ও নতুন ফুলবাড়ী শহরে সরবরাহ করা হবে। পাইপলাইনে আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামে গৃহস্থালি ব্যবহারের পানি নিশ্চিত করবে। উত্তোলিত পানির আরেকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হবে। সারা বছর বিনামূল্যে নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া, পানির স্তর নেমে যাওয়া খনির নিকটবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ অ্যাকুফারে পুনঃপ্রবেশ করানো হবে। এটি বিশ্বে একটি সুপরীক্ষিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি; যা জার্মানির খ্যাতনামা RWE খনিসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্মুক্ত খনিতে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উল্লেখ্য, পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা পর্যালোচনায় RWE এশিয়া এনার্জির সঙ্গে যুক্ত আছে।
উত্তোলিত পানির কিছু অংশ প্রয়োজনানুসারে পার্শ্ববর্তী নদী ও জলাশয়ে প্রবাহিত করা হবে যাতে পানির গুণাগুণ, বর্তমান মৌসুমী প্রবাহ এবং জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের আবাসস্থল অক্ষুন্ন থাকে। খনির কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট অপরিশোধিত কোন পানি পার্শ্ববর্তী নদী ও জলাশয়ে প্রবাহিত করা হবে না। কেবল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে পরিশোধিত পানিই প্রবাহিত করা হবে। একটি সমন্বিত পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে যাতে খনি কর্মকান্ডের প্রভাব এবং গৃহীত প্রশমণমূলক ব্যবস্থা মূল্যায়ন করা যায়।
কৃষি উন্নয়ন
ফুলবাড়ী কয়লা খনির জন্য ৫,১৯২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন, যার প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি। তবে জমি খনির আওতায় নেয়ার প্রক্রিয়া হবে পর্যায়ক্রমে এবং খনি উন্নয়নের কোনো পর্যায়েই ২,০০০ হেক্টরের বেশি জমি একসঙ্গে ব্যবহৃত হবে না। অধিগ্রহণকৃত অবশিষ্ট জমি তাই খনিতে ব্যবহারের পূর্ব পর্যন্ত এবং কয়লা উত্তোলন-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের পর জমি উৎপাদনশীল ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ব্যাপক সমীক্ষা ও মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষির উপর খনি কার্যক্রমের প্রভাব ও উন্নয়ন সুযোগ মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। কোম্পানি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এশিয়া এনার্জির জীবিকা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার একটি মূল উপাদান হচ্ছে কৃষি। একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয়, সারা বছর বিনামূল্যে সেচের পানি, মানসম্মত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি কৃষি উপকরণের মতো বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে থাকবে কৃষি উৎপাদন, গবাদিপশু ও দুগ্ধ খামার, পোল্ট্রি ও মাছ উৎপাদন, উচ্চফলনশীল ও আগাম অর্থকরী ফসলের চাষ ইত্যাদি। এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী শহরের সম্প্রসারিত পশ্চিম অংশে একটি পাইকারি বাজার স্থাপন করবে এবং কৃষকদের বাজার সংক্রান্ত তথ্য দিয়েও সহায়তা করবে। খামারভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে, যাতে কৃষকরা নিজেদের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযোগী প্রযুক্তি বেছে নিতে পারেন।
কৃষি উন্নয়নে যেসব নীতি অনুসরণ করা হবে:
- খনি উন্নয়নে প্রয়োজন না হওয়া পর্যন্ত জমি যতদিন সম্ভব কৃষির আওতায় থাকবে।
- কয়লা উত্তোলনের পর জমি পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধার করে যত দ্রুত সম্ভব কৃষিতে ফিরিয়ে আনা হবে।
- সারা বছর সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হবে, যা কৃষকদের সেচের পানির খরচও সাশ্রয় করবে।
- খনি উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর আগেই কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
- স্থানীয় জনগণের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে কৃষিভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহিত করা হবে।
কৃষির উপর খনি উন্নয়নের প্রভাব নিয়ে একটি স্বাধীন সমীক্ষায় দেখা যায়, খনি উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রথম কয়েক বছরে কৃষকরা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের পরিমাণে কিছুটা ক্ষতি দেখতে পারেন, তবে এই পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যাবে এবং খনির পুরো মেয়াদে উৎপাদনে নিট লাভ হবে। সমীক্ষায় দেখা যায়, কৃষি তার বর্তমান জীবিকানির্বাহী রূপের চেয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক জীবিকায় পরিণত হবে এবং কৃষি উৎপাদন খনন-পূর্ব পর্যায়ের দ্বিগুণেরও বেশি হবে। উন্নত ও সময়মতো কৃষি উপকরণ (বীজ, সেচের পানি, সার, কীটনাশক) এবং কারিগরি নির্দেশনার মাধ্যমে তা অর্জিত হবে।